কর্নওয়ালিসের সংস্কার

কর্নওয়ালিসের সংস্কার [Cornwallis’ Reforms]:- [১৭৮৬-৯৩ খ্রিস্টাব্দ] ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিশ ভারতে গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হয়ে আসার পর প্রথমে কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতি দমনের ব্যবস্থা করেন । তিনি মনে করতেন কম বেতন কর্মচারীদের দুর্নীতির একটি প্রধান কারণ । তাই তিনি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেন । কর্মচারীদের কাজে উৎসাহ প্রদান করার ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তিনি চাকরির বিভিন্ন স্তর বন্টন এবং পদোন্নতির নীতি চালু করেছিলেন । শাসনকার্যে যাতে তাঁরা আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারেন, সেজন্য তাঁদের ব্যক্তিগত বেআইনি ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছিলেন । এভাবে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত সততা ও আনুগত্যের উপর জোর দিয়ে তিনি ভারতে কোম্পানির শাসনব্যবস্থাকে কিছুটা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ।  

কর্নওয়ালিসের আমল থেকে শাসনকার্যে নিযুক্ত সাধারণ রাজকর্মচারীদের দুর্নীতিমুক্ত করে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থাকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে একদল শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, সুদক্ষ ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিয়োগ করার জন্য যে প্রথা চালু হয়, তা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস নামে পরিচিত । লর্ড কর্নওয়ালিসই ছিলেন ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থা তথা ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার প্রকৃত প্রবর্তক ।  সিভিল সার্ভিস প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারতে এক শ্রেণির উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীন চিত্ত, দক্ষ ও পরিশ্রমী সরকারি কর্মচারীর উদ্ভব ঘটে যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এদেশে ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় । এই জন্য ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রধান স্তম্ভ বলা হত ।

ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থাকে দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে যে সমস্ত ব্যবস্থা গৃহিত হয় :-

(১) কোম্পানির প্রশাসনিক দপ্তর, বাণিজ্য দপ্তর এবং রাজস্ব দপ্তরকে পৃথক পৃথক দপ্তরে পরিণত করা হয় ।

(২) শাসনব্যবস্থা পরিচালনা ও অন্যান্য বিভিন্ন সম্পর্কে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদের দক্ষ করে তোলা হয় ।

(৩) সিভিল সার্ভিসসহ কোম্পানির সমস্ত কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয় ।

(৪) ঘুষ ও ভেট নেওয়াকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয় ।

(৫) সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদের সচ্ছল ও সৎভাবে জীবনযাপনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত বেতন ও সুবিধা বৃদ্ধি করা হয় ।

(৬) ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ভারতে আধুনিক পুলিশিব্যবস্থার ও বিচারব্যবস্থার সূচনা হলেও লর্ড কর্নওয়ালিশের আমলে তা আরও পরিণত ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে । পরবর্তী সময়ে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত শাসন ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারগুলি এক সঙ্গে সংকলিত হয়, যা কর্নওয়ালিস কোড [Cornwallis Code] নামে পরিচিত ।

(৭)  লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতীয় প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় ‘আইনের শাসন’ প্রবর্তন করেন । আইনের শাসন -এর অর্থ হল এই যে ‘আইনের নিরপেক্ষতা’ অর্থাৎ দেশের আইনের চোখে সবাই সমান - কেউই আইনের উর্ধ্বে নয় । একটি নির্দেশের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দেন, এখন থেকে জেলা কালেক্টরসহ সমস্ত সরকার কর্মচারীকে তাদের কৃতকর্ম ও অপরাধের জন্য জেলা আদালতে অভিযুক্ত করা যাবে । এমনকি ভারতীয় প্রজারা তাদের সম্পত্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারবে । ‘আইনের শাসন’ দ্বারা লর্ড কর্নওয়ালিস তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদেরও আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করেছিলেন ।

(৮) ভারতীয়দের চরিত্র, সততা ও শাসন-দক্ষতা সম্বন্ধে লর্ড কর্নওয়ালিস খুব একটা উঁচু ধারনা পোষণ করতেন না, তাই শাসন বা বিচার বিভাগের কোনো উচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ পদে তিনি কোনো ভারতীয়কে নিয়োগ করেন নি । কর্নওয়ালিসের আমল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার উচ্চ পদগুলিতে ‘কেবল মাত্র ইউরোপীয় কর্মচারী নিয়োগ করার নীতি গ্রহন করা হয় ।

উপরোক্ত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থার প্রবর্তনে লর্ড কর্নওয়ালিসের অপরিসীম অবদান ছিল ।           

***