আমরা — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

Submitted by avimanyu pramanik on Wed, 06/30/2021 - 22:44

আমরা — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

**************************

মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে

আমরা বাঙালি বাস করি সেই তীর্থে–বরদ বঙ্গে;—

বাম হাতে যার কমলার ফুল, ডাহিনে মধুক-মালা,

ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ-মুকুট, কিরণে ভুবন আলা,

কোল-ভরা যার কনক ধান্য, বুক-ভরা যার স্নেহ,

চরণে পদ্ম, অতসী অপরাজিতায় ভূষিত দেহ,

সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে, —

আমরা বাঙালি বাস করি সেই বাঞ্ছিত ভূমি বঙ্গ ।

 

বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,

আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগেরি মাথায় নাচি ।

আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,

দশানন জয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে ।

আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়

সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয় ।

একহাতে মোরা মগেরে রুখেছি, মোগলেরে আর-হাতে,

চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লিনাথে ।

 

জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান কপিল সাঙ্খ্যকার

এই বাংলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার ।

বাঙালি অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ংকর,

জ্বালিল জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর ।

কিশোর বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি'

বাঙালির ছেলে ফিরে এল দেশে যশের মুকুট পরি' ।

বাংলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে

করেছে সুরভি সংস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে ।

 

স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে 'বরভূধরের' ভিত্তি,

শ্যাম-কম্বোজে 'ওঙ্কার-ধাম',— মোদেরি প্রাচীন কীর্তি ।

ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর

বিটপাল আর ধীমান—যাদের নাম অবিনশ্বর ।

আমাদেরি কোন সুপটু পটুয়া লীলায়িত তুলিকায়

আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজন্তায় ।

কীর্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি'

মনের গোপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি ।

 

মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি,

বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশিসে অমৃতের টিকা পরি' ।

দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি, আকাশে প্রদীপ জ্বালি,

আমাদেরি এই কুটিরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি;

ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া,

বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া ।

বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়, —

বাঙালির ছেলে ব্যাঘ্রে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয় ।

 

তপের প্রভাবে বাঙালি সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া,

আমাদের এই নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া ।

বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

মোদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া ।

বাঙালির কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান,

বিফল নহে এ বাঙালি জনম বিফল নহে এ প্রাণ ।

ভবিষ্যতের পানে মোরা চাই আশা-ভরা আহ্লাদে,

বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালি ধাতার আশীর্বাদে ।

 

বেতালের মুখে প্রশ্ন যে ছিল আমরা নিয়েছি কেড়ে,

জবাব দিয়েছি জগতের আগে ভাবনা ও ভয় ছেড়ে;

বাঁচিয়া গিয়েছি সত্যের লাগি' সর্ব কোরিয়া পণ,

সত্যে প্রণমি থেমেছে মনের অকারণ স্পন্দন ।

সাধনা ফেলেছে, প্রাণ পাওয়া গেছে জগৎ-প্রাণের হাটে,

সাগরের হাওয়া নিয়ে নিশ্বাসে গম্ভীরা নিশি কাটে;

শ্মশানের বুকে আমরা রোপণ করেছি পঞ্চবটী,

তাহারি ছায়ায় আমরা মিলাব জগতের শতকোটি ।

 

মণি অতুলন ছিল যে গোপন সৃজনের শতদলে, —

ভবিষ্যতের অমর সে বীজ আমাদেরি করতালে;

অতীতে যাহার হয়েছে সূচনা সে ঘটনা হবে হবে,

বিধাতার বরে ভরিবে ভুবন বাঙালির গৌরবে ।

প্রতিভায় তপে সে ঘটনা হবে, লাগিবে না তার বেশি,

লাগিবে না তাহে বাহুবল কিবা জাগিবে না দ্বেষাদ্বেষি;

মিলনের মহামন্ত্রে মানবে দীক্ষিত করি' ধীরে —

মুক্ত হইব দেব-ঋণে মোরা মুক্তবেণীর তীরে ।

*****

Comments

Related Items

'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে দুই রক্ষীর কথাবার্তায় সমাজের কোন ছবি ফুটে উঠেছে তা লেখ ।

প্রশ্ন : 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে দুই রক্ষীর কথাবার্তায় সমাজের কোন ছবি ফুটে উঠেছে তা লেখ

'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে রাজশ্যালকের ভূমিকা নির্দেশ কর ।

প্রশ্ন : 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে রাজশ্যালকের ভূমিকা নির্দেশ কর ।

উঃ মহাকবি কালিদাসের লেখা 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম' নাটকের ষষ্ঠ অঙ্ক থেকে 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশটি নেওয়া হয়েছে । বাংলায় এটির তরজমা করেছেন সত্যনারায়ণ চক্রবর্তী ।

'নোঙর' কীসের প্রতীক তা বুঝিয়ে দাও ।

প্রশ্ন: 'নোঙর' কীসের প্রতীক তা বুঝিয়ে দাও

'নোঙর' কবিতায় 'বাণিজ্যতরী' বাঁধা পড়ে থাকার তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর ।

প্রশ্ন:  'নোঙর' কবিতায় 'বাণিজ্যতরী' বাঁধা পড়ে থাকার তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর

"চারি মেঘে জল দেয় অষ্ট গজরাজ ।"-অষ্ট গজরাজের পরিচয় দাও ।

প্রশ্ন: "চারি মেঘে জল দেয় অষ্ট গজরাজ ।" অষ্ট গজরাজের পরিচয় দাও