National Children's Day - 14th November

                                        ১৪ই নভেম্বর - ভারতের জাতীয় শিশু দিবস

                                        Celebration of National Children’s Day

                  14th November, the birth anniversary of pandit Jawhar Lal Nehru 

 

প্রতি বছরই ১৪ই নভেম্বর দেশের সর্বত্র শিশু দিবস পালিত হয় । বছরের শুরু থেকে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা রকম দিবস পালিত হয় —যেমন ১২ই জানুয়ারী যুব দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, শ্রমদিবস, স্বাধীনতা দিবস, শিক্ষক দিবস ইত্যাদি । তবে ১৪ই নভেম্বর শিশুদিবস শিশুদের ও কিশোর-কিশোরীদের কাছে একটু অন্যরকম মাত্রা পায় । এদিন বড়োরা একটু বেশি করে শিশুদের প্রতি নজর দেয়, নানা উপহার দেয়, নানান রকম মজার মজার অনুষ্ঠান করে শিশুমনকে ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্ঠা করে থাকে ।

শিশুদিবস যাকে কেন্দ্র করে পালিত হয় তিনি হলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু । জওহরলাল নেহেরু ব্যক্তিগত জীবনে বাচ্চাদের বড় ভালোবাসতেন, বাচ্চাদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাতেন । তিনি বাচ্চাদের কাছে চাচা নেহেরু রূপে পরিচিতি পান । তাই পরবর্তীকালে ভারত সরকার পণ্ডিত নেহেরুর জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ঐ দিনটিকে শিশুদিবস বলে ঘোষণা করেন । সেদিন থেকেই ১৪ই নভেম্বর শিশুদিবস পালিত হয়ে আসছে ।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আমাদের শিশুদের একটা নিরাপদ ও ভালবাসাপূর্ণ পরিবেশ দেওয়ার জন্য আজীবন নিরলস প্রচেষ্টা করেছেন, যে পরিবেশের মধ্যে তারা বড় হবে এবং সুনাগরিক হয়ে ভারতবর্ষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেবে । এইদিনটি আমাদের প্রত্যেককে স্মরণ করায় শিশুদের মঙ্গলের জন্য আমাদের দায়িত্বের কথা এবং তাদের চাচা নেহেরুর আদর্শে এবং উদাহরণ অনুযায়ী বড় হওয়া । দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পন্ডিত নেহেরুকে দেশের বিশেষ সন্তান হিসাবে শ্রদ্ধা করা হয় । এই দিনটি আমাদের প্রত্যেককে শিশুদের মঙ্গলের জন্য আমাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয় এবং চাচা নেহেরুর মান ও স্বপ্ন অনুযায়ী বাঁচতে শেখানোর কথা মনে করিয়ে দেয় ।

জন্ম :- ১৮৮৯ সালের ১৪ই নভেম্বর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু গঙ্গা নদীর তীরে এলাহাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম মতিলাল নেহেরু ও মা স্বরুপ রাণী । মতিলাল নেহেরু এলাহবাদে একজন আইনজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিা লাভ করেন । এই সময়ে মতিলাল নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন । জওহরলাল ও তার দুই বোন বিজয়া লক্ষ্মী ও কৃষ্ণা “আনন্দ ভবন” নামক বিশাল বাড়িতে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে উঠেন । তৎকালীন ভারতের সবথেকে আধুনিক স্কুলে পড়ার পর প্রায় ১৫ বছর বয়সে নেহেরু ইংল্যান্ডের হ্যারোতে চলে যান । তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপরে কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে লেখাপড়া করেন । এরপর তিনি কেমব্রীজেই ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেন । ইংল্যান্ডে পড়ার সময় নেহেরু ভারতীয় ছাত্র সংসদের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন । এই সময়েই তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন ।

ভারতে ফিরে আসবার পরে ১৯১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জওহরলাল নেহেরু কমলা কাউলকে বিয়ে করেন । তখন তার বয়স ২৭ বছর আর তার স্ত্রীর বয়স ছিল ১৬ বছর । পরের বছরেই তাদের একমাত্র কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী জন্মগ্রহন করেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালীন সময়ে একজন আইনজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সাথে সাথে নেহেরু ভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । ১৯১৬ সালে লক্ষ্মৌ সম্মেলনে কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতার জানায় । সে সময় পিতার হাত ধরেই নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দেন ; যদিও মহাত্মা গান্ধীর ভারত আগমনের পূর্বে নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখেন নি ।

নবীন নেতা নেহেরু:-  জওহরলাল নেহেরু মহাত্মা গান্ধীর দর্শন ও নেতৃত্বের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন । এর আগে গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকার চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের এক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । ভারতে ফিরে গান্ধীজী চম্পারন ও খেদাতে কৃষক ও মজুরদের বৃটিশ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য সংগঠিত করেন । গান্ধীজীর নীতি ছিল সত্যাগ্রহ ও অহিংসা । চম্পারন আন্দোলনের সময় নেহেরু গান্ধীর সাথে পরিচিত হন এবং তাকে সাহায্য করেন । মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে জওহরলাল নেহরু ও তাঁর পরিবার মহাত্মা গান্ধীর মতো ভোগ-বিলাসের জীবন ত্যাগ করেন । তখন থেকে নেহেরু খাদির তৈরি কাপড় পরতেন । গান্ধীজীর প্রভাবে নেহেরু ভগবত গীতা পাঠ এবং যোগ-ব্যয়াম শুরু করেন । তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও গান্ধীজীর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং গান্ধীজীর সাথেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন । একজন বিশিষ্ট সংগঠক হিসেবে জওহরলাল নেহেরু উত্তর ভারতে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, বিশেষ করে যুক্তপ্রদেশ, বিহার ও কেন্দ্রীয় প্রদেশগুলোতে । পিতা মতিলাল ও গান্ধীজী গ্রেফতার হবার পর জওহরলাল নেহেরু তার মা ও বোনেদের সঙ্গে কয়েক মাস কারাবরণ করেন । গান্ধীজী ঐ সময় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন । ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চৌরিচোরাতে বাইশজন পুলিশকে বিদ্রোহীরা হত্যা করলে গান্ধীজী এহেন হিংসাত্মক ঘটনার প্রতিবাদে অনশন ত্যাগ করেন । এ ঘটনার পরে মতিলাল নেহেরু কংগ্রেস ছেড়ে স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন, যদিও জওহরলাল নেহেরু গান্ধীজীর সাথে কংগ্রেসে থেকে যান । জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ড স্থগিত রেখে সামাজিক সমস্যা ও স্থানীয় সরকারের প্রতি নজর দেন । তিনি ১৯২৪ সালে এলাহবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন । তিনি দুই বছর এই পদে আসীন থাকেন ।

নিখিল ভারতীয় রাজনীতিতে নেহেরু:- ১৯২০ সালে জওহরলাল নেহেরু নিখিল ভারত শ্রমিক ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন । ঐ সময় সুভাষ চন্দ্র বসু যথেষ্ট প্রভাবশালী নেতা ছিলেন । ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহেরুর নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । এতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতের জন্য “ডোমেনিয়ন স্টাটাস” দাবী করা হয় । মহাত্মা গান্ধী ঘোষণা করে দেন, দুই বছরের মধ্যে ভারতকে ডোমেনিয়ন স্টাটাস দেওয়া না হলে তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করবেন । ১৯২৯ সালের লাহোর সম্মেলনে গান্ধীজীর পরামর্শে জওহরলাল নেহেরুকে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় । ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহেরু রাভি নদীর তীরে এক জনসভায় ভারতের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন । ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ আন্দোলনের ডাক দেয় । লবণের উপর করারোপ করায় নেহেরু গুজরাট সহ দেশের অন্যান্য অংশে সফর করে গণআন্দোলনের ডাক দেন । তিনি এসময় গ্রেফতার হন । ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ সালের মাঝে মাত্র চার মাস ছাড়া বাকি সময় তিনি বোন ও স্ত্রীসহ কারাগারে ছিলেন । ১৯৩১ সালে জওহরলাল নেহেরুর পিতা মতিলাল নেহেরুর মৃত্যু হয় ।

“ভারত ছাড়” আন্দোলনে নেহেরু :-  ১৯৩৫ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে জওহরলাল নেহেরু সপরিবারে ইউরোপ যান । সেখানে কমলা নেহেরু চিকিৎসা নেন । ১৯৩৮ সালে কমলা নেহেরু মৃত্যু মুখে পতিত হন । ১৯৩৬ সালে জওহরলাল নেহেরু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এর লক্ষ্মৌ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন । সে সম্মেলনে ভবিষ্যত ভারতের জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করার পক্ষে জওহরলাল নেহেরু বক্তব্য রাখেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের ভাইসরয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কোন রূপ আলোচনা ছাড়াই, ভারতের পক্ষে মিত্র শক্তির বিরূদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেন । এর প্রতিবাদে সকল কংগ্রেসী জনপ্রতিনিধি তাদের পদ থেকে ইস্তফা দেন । যুদ্ধের পর ভারতীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে এই আশায় জওহরলাল নেহেরু বৃটিশদের সমর্থন দেন । অপরদিকে সুভাষ চন্দ্র বসু অক্ষ শক্তিকে সমর্থন দেন । কিন্তু বৃটিশ সরকার কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করলে গান্ধীজী ও বল্লভভাই প্যাটেল আন্দোলনের ডাক দেন । রাজাগোপালচারী এর পক্ষে ছিলেন না, অন্যদিকে জওহরলাল নেহেরু ও মোলানা আজাদ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন । অনেক আলোচনার পরে কংগ্রেস “ভারত ছাড়” আন্দোলনের ডাক দেয় । পক্ষে না থাকলেও, দলের সিদ্ধান্তে জওহরলাল নেহেরু “ভারত ছাড়” আন্দোলনকে জনপ্রিয় করতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সফর করেন । অবশেষে বৃটিশ সরকার ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট নেহেরু ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে । তারা প্রায় সকলেই ১৯৪৫ এর জুন মাস নাগাদ কারাবন্দি ছিলেন । জওহরলাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও তার স্বামী ফিরোজ গান্ধীও কয়েক মাসের জন্য গ্রেফতার হন । ১৯৪৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধীর জন্ম হয় । ১৯৪৫ সালে জেল থেকে বের হয়ে তিনি ১৯৪৬-এ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন । নির্বাচনের আগে থেকেই নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি জানাচ্ছিলেন । জওহরলাল নেহেরু ভারত বিভাগকে সমর্থন করেন । অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয় ।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী:- ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন । পরবর্তীকালে তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও দৌহিত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন । তার শাসনকালে ভারতে ব্যাপক শিল্পায়ন হয় । এই সময়ে একটি ভারত-পাকিস্তান ও একটি ভারত-চীন যুদ্ধ সংঘঠিত হয় । ভারত পাকিস্তানের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি স্বাক্ষর করেন । ১৯৬৪ সালের ২৭ শে মে পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ।

লেখক হিসেবেও নেহরু:-  জওহরলাল নেহরু ছিলেন একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আদর্শবাদী, পন্ডিত এবং কূটনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব । লেখক হিসেবেও নেহরু ছিলেন বিশিষ্ট । ইংরেজীতে লেখা তাঁর তিনটি বিখ্যাত বই- ‘একটি আত্মজীবনী’ (An Autobiography), ‘বিশ্ব ইতিহাসের কিছু চিত্র’ (Glimpses of World History), এবং  ‘ভারত আবিষ্কার’ (The Discovery of India) চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে ।

মৃত্যু:-  ১৯৬২ সালের ১ম ভারত-চীন যুদ্ধের পরে জওহরলাল নেহেরু অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাশ্মীরে কিছুদিন বিশ্রাম নেন । ১৯৬৪ সালের মে মাসে কাশ্মীর থেকে ফেরার পরে জওহরলাল নেহেরু হৃদরোগে আক্রান্ত হন । অবশেষে ১৯৬৪ সালের ২৭ মে জওহরলাল নেহেরু তার কার্যালয়ে মৃত্যু বরণ করেন ।

****