National Children's Day - 14th November

Submitted by administrator on Sun, 11/13/2011 - 08:58

                                        ১৪ই নভেম্বর - ভারতের জাতীয় শিশু দিবস

                                        Celebration of National Children's Day

                  14th November, the birth anniversary of pandit Jawhar Lal Nehru 

 

Image removed.

Image removed.প্রতি বছরই ১৪ই নভেম্বর দেশের সর্বত্র শিশু দিবস পালিত হয় । বছরের শুরু থেকে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা রকম দিবস পালিত হয় —যেমন ১২ই জানুয়ারী যুব দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, শ্রমদিবস, স্বাধীনতা দিবস, শিক্ষক দিবস ইত্যাদি । তবে ১৪ই নভেম্বর শিশুদিবস শিশুদের ও কিশোর-কিশোরীদের কাছে একটু অন্যরকম মাত্রা পায় । এদিন বড়োরা একটু বেশি করে শিশুদের প্রতি নজর দেয়, নানা উপহার দেয়, নানান রকম মজার মজার অনুষ্ঠান করে শিশুমনকে ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্ঠা করে থাকে ।

শিশুদিবস যাকে কেন্দ্র করে পালিত হয় তিনি হলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু । জওহরলাল নেহেরু ব্যক্তিগত জীবনে বাচ্চাদের বড় ভালোবাসতেন, বাচ্চাদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাতেন । তিনি বাচ্চাদের কাছে চাচা নেহেরু রূপে পরিচিতি পান । তাই পরবর্তীকালে ভারত সরকার পণ্ডিত নেহেরুর জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ঐ দিনটিকে শিশুদিবস বলে ঘোষণা করেন । সেদিন থেকেই ১৪ই নভেম্বর শিশুদিবস পালিত হয়ে আসছে ।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আমাদের শিশুদের একটা নিরাপদ ও ভালবাসাপূর্ণ পরিবেশ দেওয়ার জন্য আজীবন নিরলস প্রচেষ্টা করেছেন, যে পরিবেশের মধ্যে তারা বড় হবে এবং সুনাগরিক হয়ে ভারতবর্ষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেবে । এইদিনটি আমাদের প্রত্যেককে স্মরণ করায় শিশুদের মঙ্গলের জন্য আমাদের দায়িত্বের কথা এবং তাদের চাচা নেহেরুর আদর্শে এবং উদাহরণ অনুযায়ী বড় হওয়া । দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পন্ডিত নেহেরুকে দেশের বিশেষ সন্তান হিসাবে শ্রদ্ধা করা হয় । এই দিনটি আমাদের প্রত্যেককে শিশুদের মঙ্গলের জন্য আমাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয় এবং চাচা নেহেরুর মান ও স্বপ্ন অনুযায়ী বাঁচতে শেখানোর কথা মনে করিয়ে দেয় ।

জন্ম :- ১৮৮৯ সালের ১৪ই নভেম্বর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু গঙ্গা নদীর তীরে এলাহাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম মতিলাল নেহেরু ও মা স্বরুপ রাণী । মতিলাল নেহেরু এলাহবাদে একজন আইনজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিা লাভ করেন । এই সময়ে মতিলাল নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন । জওহরলাল ও তার দুই বোন বিজয়া লক্ষ্মী ও কৃষ্ণা "আনন্দ ভবন" নামক বিশাল বাড়িতে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে উঠেন । তৎকালীন ভারতের সবথেকে আধুনিক স্কুলে পড়ার পর প্রায় ১৫ বছর বয়সে নেহেরু ইংল্যান্ডের হ্যারোতে চলে যান । তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপরে কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে লেখাপড়া করেন । এরপর তিনি কেমব্রীজেই ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেন । ইংল্যান্ডে পড়ার সময় নেহেরু ভারতীয় ছাত্র সংসদের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন । এই সময়েই তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন ।

ভারতে ফিরে আসবার পরে ১৯১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জওহরলাল নেহেরু কমলা কাউলকে বিয়ে করেন । তখন তার বয়স ২৭ বছর আর তার স্ত্রীর বয়স ছিল ১৬ বছর । পরের বছরেই তাদের একমাত্র কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী জন্মগ্রহন করেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালীন সময়ে একজন আইনজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সাথে সাথে নেহেরু ভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । ১৯১৬ সালে লক্ষ্মৌ সম্মেলনে কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতার জানায় । সে সময় পিতার হাত ধরেই নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দেন ; যদিও মহাত্মা গান্ধীর ভারত আগমনের পূর্বে নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখেন নি ।

নবীন নেতা নেহেরু:-  জওহরলাল নেহেরু মহাত্মা গান্ধীর দর্শন ও নেতৃত্বের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন । এর আগে গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকার চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের এক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । ভারতে ফিরে গান্ধীজী চম্পারন ও খেদাতে কৃষক ও মজুরদের বৃটিশ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য সংগঠিত করেন । গান্ধীজীর নীতি ছিল সত্যাগ্রহ ও অহিংসা । চম্পারন আন্দোলনের সময় নেহেরু গান্ধীর সাথে পরিচিত হন এবং তাকে সাহায্য করেন । মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে জওহরলাল নেহরু ও তাঁর পরিবার মহাত্মা গান্ধীর মতো ভোগ-বিলাসের জীবন ত্যাগ করেন । তখন থেকে নেহেরু খাদির তৈরি কাপড় পরতেন । গান্ধীজীর প্রভাবে নেহেরু ভগবত গীতা পাঠ এবং যোগ-ব্যয়াম শুরু করেন । তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও গান্ধীজীর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং গান্ধীজীর সাথেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন । একজন বিশিষ্ট সংগঠক হিসেবে জওহরলাল নেহেরু উত্তর ভারতে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, বিশেষ করে যুক্তপ্রদেশ, বিহার ও কেন্দ্রীয় প্রদেশগুলোতে । পিতা মতিলাল ও গান্ধীজী গ্রেফতার হবার পর জওহরলাল নেহেরু তার মা ও বোনেদের সঙ্গে কয়েক মাস কারাবরণ করেন । গান্ধীজী ঐ সময় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন । ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চৌরিচোরাতে বাইশজন পুলিশকে বিদ্রোহীরা হত্যা করলে গান্ধীজী এহেন হিংসাত্মক ঘটনার প্রতিবাদে অনশন ত্যাগ করেন । এ ঘটনার পরে মতিলাল নেহেরু কংগ্রেস ছেড়ে স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন, যদিও জওহরলাল নেহেরু গান্ধীজীর সাথে কংগ্রেসে থেকে যান । জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ড স্থগিত রেখে সামাজিক সমস্যা ও স্থানীয় সরকারের প্রতি নজর দেন । তিনি ১৯২৪ সালে এলাহবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন । তিনি দুই বছর এই পদে আসীন থাকেন ।

নিখিল ভারতীয় রাজনীতিতে নেহেরু:- ১৯২০ সালে জওহরলাল নেহেরু নিখিল ভারত শ্রমিক ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন । ঐ সময় সুভাষ চন্দ্র বসু যথেষ্ট প্রভাবশালী নেতা ছিলেন । ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহেরুর নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । এতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতের জন্য "ডোমেনিয়ন স্টাটাস" দাবী করা হয় । মহাত্মা গান্ধী ঘোষণা করে দেন, দুই বছরের মধ্যে ভারতকে ডোমেনিয়ন স্টাটাস দেওয়া না হলে তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করবেন । ১৯২৯ সালের লাহোর সম্মেলনে গান্ধীজীর পরামর্শে জওহরলাল নেহেরুকে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় । ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহেরু রাভি নদীর তীরে এক জনসভায় ভারতের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন । ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ আন্দোলনের ডাক দেয় । লবণের উপর করারোপ করায় নেহেরু গুজরাট সহ দেশের অন্যান্য অংশে সফর করে গণআন্দোলনের ডাক দেন । তিনি এসময় গ্রেফতার হন । ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ সালের মাঝে মাত্র চার মাস ছাড়া বাকি সময় তিনি বোন ও স্ত্রীসহ কারাগারে ছিলেন । ১৯৩১ সালে জওহরলাল নেহেরুর পিতা মতিলাল নেহেরুর মৃত্যু হয় ।

"ভারত ছাড়" আন্দোলনে নেহেরু :-  ১৯৩৫ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে জওহরলাল নেহেরু সপরিবারে ইউরোপ যান । সেখানে কমলা নেহেরু চিকিৎসা নেন । ১৯৩৮ সালে কমলা নেহেরু মৃত্যু মুখে পতিত হন । ১৯৩৬ সালে জওহরলাল নেহেরু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এর লক্ষ্মৌ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন । সে সম্মেলনে ভবিষ্যত ভারতের জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করার পক্ষে জওহরলাল নেহেরু বক্তব্য রাখেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের ভাইসরয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কোন রূপ আলোচনা ছাড়াই, ভারতের পক্ষে মিত্র শক্তির বিরূদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেন । এর প্রতিবাদে সকল কংগ্রেসী জনপ্রতিনিধি তাদের পদ থেকে ইস্তফা দেন । যুদ্ধের পর ভারতীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে এই আশায় জওহরলাল নেহেরু বৃটিশদের সমর্থন দেন । অপরদিকে সুভাষ চন্দ্র বসু অক্ষ শক্তিকে সমর্থন দেন । কিন্তু বৃটিশ সরকার কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করলে গান্ধীজী ও বল্লভভাই প্যাটেল আন্দোলনের ডাক দেন । রাজাগোপালচারী এর পক্ষে ছিলেন না, অন্যদিকে জওহরলাল নেহেরু ও মোলানা আজাদ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন । অনেক আলোচনার পরে কংগ্রেস "ভারত ছাড়" আন্দোলনের ডাক দেয় । পক্ষে না থাকলেও, দলের সিদ্ধান্তে জওহরলাল নেহেরু "ভারত ছাড়" আন্দোলনকে জনপ্রিয় করতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সফর করেন । অবশেষে বৃটিশ সরকার ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট নেহেরু ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে । তারা প্রায় সকলেই ১৯৪৫ এর জুন মাস নাগাদ কারাবন্দি ছিলেন । জওহরলাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও তার স্বামী ফিরোজ গান্ধীও কয়েক মাসের জন্য গ্রেফতার হন । ১৯৪৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধীর জন্ম হয় । ১৯৪৫ সালে জেল থেকে বের হয়ে তিনি ১৯৪৬-এ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন । নির্বাচনের আগে থেকেই নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি জানাচ্ছিলেন । জওহরলাল নেহেরু ভারত বিভাগকে সমর্থন করেন । অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয় ।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী:- ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন । পরবর্তীকালে তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও দৌহিত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন । তার শাসনকালে ভারতে ব্যাপক শিল্পায়ন হয় । এই সময়ে একটি ভারত-পাকিস্তান ও একটি ভারত-চীন যুদ্ধ সংঘঠিত হয় । ভারত পাকিস্তানের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি স্বাক্ষর করেন । ১৯৬৪ সালের ২৭ শে মে পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ।

লেখক হিসেবেও নেহরু:-  জওহরলাল নেহরু ছিলেন একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আদর্শবাদী, পন্ডিত এবং কূটনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব । লেখক হিসেবেও নেহরু ছিলেন বিশিষ্ট । ইংরেজীতে লেখা তাঁর তিনটি বিখ্যাত বই- 'একটি আত্মজীবনী' (An Autobiography), 'বিশ্ব ইতিহাসের কিছু চিত্র' (Glimpses of World History), এবং  'ভারত আবিষ্কার' (The Discovery of India) চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে ।

মৃত্যু:-  ১৯৬২ সালের ১ম ভারত-চীন যুদ্ধের পরে জওহরলাল নেহেরু অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাশ্মীরে কিছুদিন বিশ্রাম নেন । ১৯৬৪ সালের মে মাসে কাশ্মীর থেকে ফেরার পরে জওহরলাল নেহেরু হৃদরোগে আক্রান্ত হন । অবশেষে ১৯৬৪ সালের ২৭ মে জওহরলাল নেহেরু তার কার্যালয়ে মৃত্যু বরণ করেন ।

****

Comments

Related Items