সাবান ও ডিটারজেন্ট

সাবান [Soap]:-

সাবান হল উচ্চ আণবিক ওজন বিশিষ্ট জৈব ফ্যাটি অ্যাসিড (যেমন— ওলিক অ্যাসিড, স্টিয়ারিক অ্যাসিড, পামিটিক অ্যাসিড) -এর সোডিয়াম বা পটাশিয়াম লবণ । একাধিক জৈব অ্যাসিডের লবণ হওয়ায় সাবানের নির্দিষ্ট কোনো সংকেত নেই । সাবান একটি মিশ্র লবণ ।

প্রকৃতি:-

[i} সাধারণ উষ্ণতায় সাবান অনুদ্বায়ী কঠিন পদার্থ ও জলে দ্রাব্য ।

[ii] সাবানের জলীয় দ্রবণ ক্ষারীয় ।  জলে মিশে ফেনা উত্পন্ন করে ।

[iii] সাবান তৈরির জন্য নারিকেল, তিল ও তুলোবীজের তেল, এবং প্রাণীজ চর্বি ব্যবহার করা হয় । এই তেলের সঙ্গে তীব্র ক্ষার, যেমন— NaOH বা KOH -এর বিক্রিয়ায় সাবান উত্পন্ন হয় । এই বিক্রিয়াকে সাবানীভবন বলে ।

[iv] দ্রবীভূত সাবান হল সোডিয়াম পল্মিটেট C15H31COONa),  সোডিয়াম অলিয়েট (C17H33COONa), সোডিয়াম স্টিয়ারেট (C17H35COONa) ইত্যাদি জলে দ্রবীভূত সাবান বলে, মৃদু জলে প্রচুর ফেনা উত্পন্ন করে । সাবান জল মেশালে আর্দ্র-বিশ্লেষণ ঘটে ক্ষার উত্পন্ন করে, সেজন্য সাবান জল পিচ্ছিল বোধ হয় ।

[v] সাবান জৈব অ্যাসিডের অজৈব লবণ ।

[vi] সাবান সাদা ও গন্ধহীন । উপাদানের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন বর্ণ ও গন্ধযুক্ত সাবান পাওয়া যায় ।

[vii] সোডিয়াম সাবান শক্ত হয় । এটি জামা-কাপড় কাচতে ব্যবহার করা হয় ।

[viii] পটাসিয়াম সাবান নরম হয় । এর সঙ্গে সুগন্ধি ও রং মিশিয়ে গায়ে মাখার সাবান প্রস্তুত করা হয় ।   

ব্যবহার:-

[i] জামা-কাপড় পরিষ্কার করতে এবং দেহের ময়লা দূর করতে সাবান ব্যবহৃত হয় ।

[ii] জীবাণুনাশক হিসাবে কার্বলিক সাবান, নিম সাবান ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় ।

[iii] রঞ্জন শিল্পে সাবান ব্যবহৃত হয় ।

 

ডিটারজেন্ট [Detergent]:-

ডিটারজেন্ট হল লবণ জাতীয় জৈব ও অজৈব পদার্থের মিশ্রণ । ডিটারজেন্টের গঠন অনেকটা সাবানের মত । এর অণুর একটি অংশ জলঅনুরাগী এবং অপরটি জলবিরাগী । এগুলি কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের হাইড্রোকার্বন থেকে তৈরি হয় । হাইড্রোকার্বনের অংশটি জলবিরাগী এবং জলঅনুরাগী অংশটি সালফেট বা সালফোনেট দিয়ে গঠিত । ওয়াশিং পাউডারে প্রায় 10-30% ডিটারজেন্ট থাকে । ডিটারজেন্টে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম সিলিকেট মেশানো হয়, কারণ এরা ডিটারজেন্টকে শুষ্ক রাখে । ডিটারজেন্টের সঙ্গে সোডিয়াম ট্রাইপলি ফসফেট বা সোডিয়াম কার্বনেট মিশিয়ে একে ক্ষারীয় করলে এর ময়লা পরিষ্কারের ক্ষমতা অনেকগুণ বেড়ে যায় । ডিটারজেন্টের কার্বক্সি মিথাইল সেলুলোজ উপাদানটি জলের মধ্যে ময়লার অণুগুলিকে প্রলম্বিত রাখে । ব্লিচিং পদার্থ হিসাবে সোডিয়াম পারবোরেট মেশালে শুভ্রতা বাড়ে ।               

সাবানের পরিবর্তে জামা-কাপড় কাচা বা ধোয়ার জন্য বহুল পরিমাণে ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে । সমস্ত ডিটারজেন্ট কিন্তু একই সংযুক্তি থাকে না । প্রচলিত দুটি সিন্থেটিক ডিটারজেন্ট হল— (1) দীর্ঘ শৃঙ্খল সোডিয়াম অ্যালকিল সালফেট [CH3 - (CH2)10 - CH2 - SO-4Na+] এবং  (2) দীর্ঘ শৃঙ্খল সোডিয়াম অ্যালকিল বেঞ্জিন সালফানেট [CH3 - (CH2)11 - C6H4 - SO-3Na+] । বর্তমানে দ্বিতীয় ডিটারজেন্টটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে ।

প্রকৃতি:-

[i] ডিটারজেন্ট বস্তুটি গন্ধহীন, বর্ণহীন অনুদ্বায়ী কঠিন পদার্থ ।

[ii] এটি কঠিন ও তরল উভয় প্রকারের হয় এবং এটি একটি জৈব লবণ যা জলে সম্পূর্ণ দ্রবণীয় ।

[iii] সাধারণ অবস্থায় ডিটারজেন্ট প্রশম পদার্থ কিন্তু জলে দ্রবীভূত করলে ক্ষারীয় হয় ।

ব্যবহার:- বর্তমান যুগে ডিটারজেন্টের ব্যবহার ব্যাপক । শুধুমাত্র কাপড় কাচার কাজ নয়, শ্যাম্পুতে, মুখ পরিষ্কার [Mouth wash] করতে ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা হয় । তাছাড়া জীবাণুনাশক হিসাবে ও খর জলে ফেনা উত্পন্ন করতে সাবানের অসুবিধা হলেও ডিটারজেন্টের হয় না । অ্যাসিড মিশ্রিত জল হলেও ডিটারজেন্ট ব্যবহারে অসুবিধা হয় না ।

পরিবেশ দুষণ:- ডিটারজেন্টগুলি বায়োডিগ্রেডেবল নয়, সহজে এরা জল বা মাটির সঙ্গে মিশে অন্য পদার্থে বিয়োজিত হতে পারে না । এদের দীর্ঘ শৃঙ্খলগুলি প্রায় অবিকৃতভাবে জলের মধ্যে থাকে, তাতে জল দুষিত হয় । পরিণামে জলজ জীবনের ক্ষতি হয় এবং পরিবেশ দূষণ ঘটে ।

***