জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা

জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা [Birth of the Indian National Congress]:- উনবিংশ শতাব্দীর সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক প্রয়াস এই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল । জাতীয় কংগ্রেসের উত্পতি সম্পর্কে বিভিন্ন মত ও তত্ত্ব প্রচলিত আছে ।

(১) ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে জমিদারদের সমিতি [Landholder’s Society] প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ভারতবর্ষে যে সব সভা, সমিতি বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারই সর্বশেষ পরিণতি হল জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ।

(২) প্রকৃতপক্ষে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলনকে কংগ্রেসের সূচনা পর্ব বলা যায় । ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠির ভাষায়, ‘কংগ্রেসের প্রায় দুবছর আগে তাঁর জাতীয় কনফারেন্সের প্রথম (কলকাতা) অধিবেশনকে জাতীয় কংগ্রেসের মহড়া বলা চলে ।”

(৩) ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে লর্ড রিপনের বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষ্যে সমবেত নেতৃবৃন্দ একত্র আলাপ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নেন । অনেকে এই উদ্যোগকেই কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ বলে মনে করেন ।

(৪) জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের অবদান ও তাঁর safety valve তত্ত্ব স্মরনীয় ।  অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজকর্মচারী অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম উপলব্ধি করেছিলেন যে ব্রিটিশ শাসনে ভারতবাসীর মধ্যে যে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছে তা যথাযত প্রকাশের সুযোগ করে না দিলে একদিন তা বিস্ফোরণের আকারে দেখা দিতে পারে । অতএব তিনি ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লিখে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক উত্কর্ষ সাধনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরামর্শ দেন । এ ব্যাপারে তিনি লর্ড ডাফরিনের সম্মতিও আদায় করেছিলেন । ডাফরিনও চেয়েছিলেন হিউমের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক যা ভারতে ইংল্যান্ডের মতো বিরোধী দলের ভুমিকা পালন করতে পারে । ভারতীয়দের ব্রিটিশবিরোধী পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিরসনের জন্যই ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ শে ডিসেম্বর অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্দ্যোগে এবং ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে বোম্বাই -এ সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয় ।  যদিও কোনো কোনোঐতিহাসিক হিউমকে কোনো কৃতিত্ব দিতে রাজি নয় । আবার অনেকে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রকৃত উদ্যোক্তা বলে মনে করেন । জাতীয় কংগ্রেস গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হিউম বলেছিলেন, ‘সেই সময় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র চলছিল । অবিলম্বে যদি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হত, তাহলে ভারতে হিংসাত্মক বিপ্লব ছিল অনিবার্য’ ।  ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতিরোধক সেফটি ভালভ (Safety Valve) হিসাবে তিনি জাতীয় কংগ্রেস গঠন করার পরিকল্পনা করেন, একেই ‘সেফটি ভালভ তত্ত্ব’ বলা হয় । তিনি মনে করেছিলেন যে, একমাত্র ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে হিংসাত্মক অভ্যুত্থান নিবারণ করা সম্ভব হবে ।

(৫)  হিউমের ‘সেফটি ভালভ তত্ত্ব’–ই যে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার মূল কারণ তা বলা যায় না । জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল স্বদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন ভারতীয় নেতাদের প্রবল আকাঙ্খা । যে সব ভারতীয় নেতা হিউমের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁদের উদ্যোগেই জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ।

***