অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[প্রথম অধ্যায়- ২য়: অংশ]

প্রশ্ন:- (৬) অমৃতসরের সন্ধি (১৮০৯ খ্রি.) কাদের মধ্যে হয়েছিল ? এই সন্ধির শর্ত কী কী ছিল ?  ইংরেজদের সঙ্গে রণজিৎ সিংহের সম্পর্ক বর্ণনা কর।

উত্তরঃ-  রণজিৎ সিংহ এবং ইংরেজ গভর্নর-জেনারেল লর্ড মিন্টোর মধ্যে অমৃতসরের সন্ধি হয়েছিল ।

অমৃতসরের সন্ধির শর্তগুলি ছিলঃ

১) শতদ্রু নদীকে রণজিৎ সিংহের রাজ্যের পূর্ব সীমারেখা বলে স্থির করা হবে ।

২) শতদ্রু নদীর পূর্ব তীরের রাজ্যগুলির ওপর ইংরেজদের আধিপত্য স্বীকার করা হবে ।

৩) উভয় পক্ষকে ‘স্থায়ী মৈত্রী’ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে ।

ইংরেজদের সঙ্গে রণজিৎ সিংহের সম্পর্কঃ

অখিল শিখরাজ্য গঠনের উদ্দেশ্যে রণজিৎ সিং ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অমৃতসর দখল করে শতদ্রু নদীর পশ্চিম তীরের শিখ রাজ্যগুলি জয় করার পর তিনি শতদ্রুর পূর্ব তীরস্থ রাজ্যগুলিকেও নিজের অধিকারে আনতে চেষ্টা করলে এইসব শিখ রাজ্যগুলো রণজিৎ সিংহের আধিপত্য অস্বীকার করে ও ইংরেজদের শরণাপন্ন হয় ।

[১] অমৃতসরের সন্ধিঃ- শতদ্রু নদীর পূর্ব তীরে রণজিৎ সিংহের বিস্তার রোধ করার উদ্দেশ্যে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর-জেনারেল লর্ড মিন্টোর আদেশে চার্লস মেটকাফ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রণজিৎ সিংহের সঙ্গে অমৃতসরের সন্ধি স্বাক্ষর করেন ।

অমৃতসরের চুক্তির ফলে রণজিৎ সিংহের পক্ষে শতদ্রু নদীর পূর্বতীরে রাজ্য বিস্তারের আর কোনো সুযোগ রইল না ।

যাই হোক, অমৃতসরের সন্ধির পরবর্তী সময়ে তিনি মুলতান, ঝঙ্গ, কাশ্মীর, ডেরা ইস্‌মাইল খাঁ, ডেরা গাজি খাঁ ও পেশোয়ার  অধিকার করেন । যার ফলে তাঁর সাম্রাজ্য লাহোর থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত হয় ।

অমৃতসরের সন্ধির ফলে

(ক) শতদ্রু নদীকে রণজিৎ সিংহের রাজ্যের পূর্ব সীমা বলে ইংরেজরা মেনে নেন এবং

(খ) শতদ্রু নদীর পূর্ব তীরের রাজ্যগুলির ওপর ইংরেজদের আধিপত্য স্বীকার করা হয়।

[২] চিরস্থায়ী মিত্রতা চুক্তিঃ ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর-জেনারল উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক লাহোরে এসে রণজিৎ সিংহের সঙ্গে চিরস্থায়ী মিত্রতা স্থাপণ করেন, কিন্তু এই মৈত্রীচুক্তির ফলে সিন্ধুদেশে রণজিৎ সিংহের আধিপত্য হ্রাস পায়।

[৩] ত্রিশক্তি মৈত্রী চুক্তিঃ আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে রণজিৎ সিংহ অত্যন্ত কূটনৈতিক চাতুর্যের পরিচয় দেন । ইংরেজদের পরোক্ষ সহযোগিতায় সাময়িকভাবে আফগানিস্তানের উপর নিজের  আধিপত্য কায়েমে সক্ষম হলেও ইংরেজদের হস্তক্ষেপের ফলে ১৮৩৮ সালে শাহ্‌ সুজা, ইংরেজ ও রণজিৎ সিংহের মধ্যে ত্রিশক্তি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অবশেষে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে রণজিৎ সিংহের মৃত্যু হয়।

এইভাবে প্রতিটি ব্যাপারেই উংরেজদের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে রণজিৎ সিংহ নিজের অস্তিত্বকে বজায় রেখে চলেছিলেন— কারণ সমসাময়িক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে রণজিৎ সিংহ সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, অমিতশক্তিশালী ব্রিটিশ শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে তিনি কোনোদিনই জয়লাভ করতে পারবেন না । তাই বাস্তবোচিত নীতি গ্রহণ করে তিনি নিজের বুদ্ধিদীপ্ততা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন ।

মূল্যায়নঃ ইংরেজদের সঙ্গে রণজিৎ সিংহের সম্পর্ক কেমন ছিল তা বিশ্লেষণ করেত গিয়ে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ডঃ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ বলেছেন যে, ‘ইঙ্গ-শিখ মৈত্রীর ক্ষেত্রে রণজিৎ সিংহ ছিলেন ঘোড়া এবং ইংরেজরা ছিলেন সেই ঘোড়ার চালক’। বস্তুত রণজিৎ সিংহ ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে শিখ রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা করে যেতে পারেননি।

 

প্রশ্ন:- (৭) কোন কোন যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজরা মারাঠা শক্তির পতন ঘটিয়ে ছিল ? ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেবিস্তারের ক্ষেত্রে মারাঠা শক্তির পতনের গুরুত্ব কী ছিল ? কীভাবে মারাঠারা ইংরেজদের পদানত হয় সংক্ষেপে তার বর্ণনা দাও।

উত্তরঃ  প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজরা মারাঠা শক্তির পতন ঘটায় ।

মারাঠা শক্তির পতনের গুরুত্ব-

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে মারাঠা শক্তির পতনের ফলে পূর্ব ভারতে কলকাতা থেকে পশ্চিম ভারতের মুম্বাই পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইংরেজদের কাছে মারাঠা শক্তির পতনঃ

(১) প্রথম ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধঃ  পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে আহম্মদ শাহ আবদালির কাছে মারাঠাদের বিপর্যয় ঘটলেও পেশোয়া মাধব রাও-এর আমলে মারাঠারা আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পেশোয়া মাধব রাও-এর অকাল মৃত্যুর পর তাঁর নাবালক ভ্রাতা নারায়ণ রাও পেশোয়া হন, কিন্তু তাঁর পিতৃব্য রঘুনাথ রাও ষড়যন্ত্র করে নারায়ণ রাওকে হত্যা করে পেশোয়া পদ দখল করেন। এর পর নানা ফড়নাবীশ প্রমুখ মারাঠা নেতারা রঘুনাথ রাও-কে গদিচ্যুত করলে রঘুনাথ রাও ইংরেজদের সাহায্যপ্রার্থী হন। এইভাবে প্রথম ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত হলে (১৭৭৫ - ৮১ খ্রি.) পূণার কাছে ইংরেজ বাহিনী পরাস্ত হয়। এরপর ইংরেজরা রঘুনাথ রাও-এর পক্ষ ত্যাগ করে।

 

(২) দ্বিতীয় ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধঃ  ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে, হোলকার পেশোয়াকে পুণা থেকে তাড়িয়ে দিলে, তিনি ইংরেজদের শরণাপন্ন হন এবং রাজ্য পুনরুদ্ধারের আশায় পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও ইংরেজদের ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’প্রস্তাবে রাজি হন। এই সময় দুই মারাঠা নায়ক সিন্ধিয়া ও ভোঁসলে ইংরেজদের প্রতিপত্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে কোম্পানির রাজ্য আক্রমণ করলে দ্বিতীয় ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের  সূত্রপাত হয় (১৮০৩ খ্রি.), কিন্তু এই যুদ্ধে তাঁরা পরাস্ত হন। এরপর সিন্ধিয়া ইংরেজদের সঙ্গে ‘অধীনতামূলক মিত্রতায়’ আবদ্ধ হন।

 

(৩) তৃতীয় ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ ও মারাঠা শক্তির পতনঃ  গভর্নর-জেনারেল লর্ড ময়রার শাসনকালে (১৮১৩ - ২৩ খ্রি.) ইংরেজরা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-কে এক নতুন অপমানজনক সন্ধি স্বাক্ষর করার জন্য বাধ্য করলে তিনি বিদ্রোহী হন। সেই সুযোগে হোলকার ও ভোঁসলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন, ফলে তৃতীয় ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত হয় (১৮১৭ - ১৯ খ্রি.)। পেশোয়া কিড়কির যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন এবং পরবর্তীকালে হোলকার ও ভোঁসলে পৃথক পৃথক যুদ্ধে পরাস্ত হন।

এই যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে 

(১) মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়,

(২) পেশোয়ার রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং

(৩) হোলকার ও ভোঁসলে ইংরেজদের অধীন-মিত্র হিসাবে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

 

প্রশ্ন:- (৮)  কবে, কাদের মধ্যে অমৃতসরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ? কোন্‌ যুদ্ধের পর পাঞ্জাব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় ? তখন ভারতের গভর্নর-জেনারেল কে ছিলেন ? এই যুদ্ধের গুরুত্ব লেখো ।

উত্তরঃ  ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে রণজিৎ সিংহ এবং ইংরেজদের পক্ষে গভর্নর-জেনারেল লর্ড মিন্টোর প্রতিনিধি হিসাবে চার্লস মেটকাফ -এর মধ্যে অমৃতসরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের সময় গুজরাটের যুদ্ধে (ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৯ খ্রি.) শিখরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং সমগ্র পাঞ্জাব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

তখন ভারতের গভর্নর-জেনারেল ছিলেন লর্ড ডালহৌসি

গুজরাটের যুদ্ধের গুরুত্ব :-

১) গুজরাটের যুদ্ধে শিখরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়;

২) রণজিৎ সিংহের প্রতিষ্ঠিত শিখ রাজ্যের পতন ঘটে;

৩) সমগ্র পাঞ্জাব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়;

৪) শিখ খালসা বাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়;

৫) শিখ মহারাজা দলীপ সিংহ সিংহাসনচ্যুত হয়ে লন্ডনে নির্বাসিত হন।

 

প্রশ্ন:- (৯) অমৃতসরের চুক্তি কোন সালে স্বাক্ষরিত হয় ? এই চুক্তির শর্তগুলি কী ছিল ? পাঞ্জাবকে কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ?

ঊত্তরঃ  ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে রণজিৎ সিংহ এবং ইংরেজদের পক্ষে গভর্নর-জেনারেল লর্ড মিন্টোর প্রতিনিধি হিসাবে চার্লস মেটকাফ -এর মধ্যে অমৃতসরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

অমৃতসরের সন্ধির শর্ত অনুসারে ঠিক হয় যে শতদ্রু নদীর পূর্ব দিকে  রণজিৎ সিংহ আর রাজ্য বিস্তার করতে পারবে না । অমৃতসরের সন্ধির মাধ্যমে ইংরেজরা শতদ্রু নদীর পূর্বদিকে রণজিৎ সিংহের রাজ্য বিস্তার সম্পূর্ণ রূপে রোধ করে ছিল । অর্থাৎ অমৃতসরের সন্ধির ফলে রণজিৎ সিংহের মর্যাদাহানি ঘটে, অন্যদিকে ইংরেজদের রাজ্য ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

পাঞ্জাবকে কীভাবে ব্রটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়?

[১] প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ (১৮৪৫ খ্রি.) ও  লাহোরের সন্ধি (১৮৪৬ খ্রি.): মহারাজ রণজিৎ সিংহের মৃত্যুর পর ‘প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে’ শিখদের পরাজয়ের ফলশ্রুতিতে শিখরা ইংরেজদের সঙ্গে লাহোরের সন্ধি (১৮৪৬ খ্রি.) করতে বাধ্য হয় । এই সন্ধির শর্ত অনুসারে শিখরা

(১) যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইংরেজ কোম্পানিকে ১৫ লক্ষ স্টলিং দিতে বাধ্য হয়;

(২) কাশ্মীর ও জলন্ধর অঞ্চল কোম্পানিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়;

(৩) শিখ সৈন্যদলের সংখ্যা হ্রাস করতে বাধ্য হয়;

(৪) রাজধানী লাহোরে ব্রিটিশ সেনাদল রাখার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া

(৫) লাহোর দরবারে একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন।

[২] চিলিয়ানওয়ালার যুদ্ধ (জানুয়ারি ১৮৪৯ খ্রি.): এই যুদ্ধে ইংরেজরা জয়যুক্ত হয়।

[৩] গুজরাটের যুদ্ধ (ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৯ খ্রি.):

(১) এই যুদ্ধে শিখরা চুড়ান্তভাবে পরাজিত হয়;

(২) শিখ খালসা বাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়;

৩) শিখ মহারাজা দলীপ সিংহ সিংহাসনচ্যুত হয়ে লন্ডনে নির্বাসিত হন।

৪) রণজিৎ সিংহের প্রতিষ্ঠিত শিখ রাজ্যের পতন ঘটে;

৫) সমগ্র পাঞ্জাব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আফগানিস্থানের সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।

 

প্রশ্ন:- (১০)  বাংলার দ্বৈতশাসনের অবসান কোন্‌ সালে ঘটে ? কী কী কারণে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন ?  আইনের শাসন বা Rule of law কী ?

উত্তরঃ  ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটে।

নিম্নলিখিত কারণে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেনঃ

১) বাংলার দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কুফল, দায়িত্বজ্ঞানহীন শাসনব্যবস্থা, বল্গাহীন শোষণ প্রভৃতির কথা ইংল্যান্ডে প্রচারিত হলে ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ সমাজে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজেকর্মে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

২) বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের বিভীষিকাময় খবরে বিচলিত ইংল্যান্ডের শাসকবর্গ এটা পরিষ্কার ভাবে উপলব্ধি করেন যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখন আর নিছক একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নয়, তা এখন একটি সাম্রাজ্য পরিচালনা করে, যা আরও সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

৩) ইংল্যান্ডের শাসকবর্গের কাছে আরও খবর এসে পৌছায় যে, দ্বৈতশাসন বাংলার বিশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থাকে আরও বিশৃঙ্খল এবং দূর্নীতিগ্রস্থ করে তুলেছে । কারণ কোম্পানির ‘নায়েব-দেওয়ান’ও কর্মচারীরা কোম্পানির স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থরক্ষাতেই ব্যস্ত থাকেন।

৪) পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভের পর থেকেই কোম্পানির কর্মচারীরা দুর্নীতি, ঘুষ, ভেট এবং ব্যক্তিগত বাণিজ্যসহ নানান অবৈধ উপায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করে দেশে ফিরে গিয়ে মহা আড়ম্বরের সঙ্গে বাস করতে থাকেন। ভারত প্রত্যাগত এইসব কর্মচারীদের দেখে একদিকে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়ে পড়েন, অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রনে এনে এই সব অসৎ কর্মচারীদের শায়েস্তা করার সু্যোগ খুঁজতে থাকেন । ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনেক সদস্য নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে বলেন যে, ‘কোম্পানির কার্যকলাপ ব্রিটিশ জাতির নামে কলঙ্ক লেপন করেছে, সুতরাং এখনই কিছু করা প্রয়োজন’।

৫) বাংলা তথা ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে সম্পদ লুট করেও কোম্পানির আর্থিক অবস্থার কিন্তু বিশেষ কোনও উন্নতি হয়নি, বরং তাদের আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে থাকে। এই অবস্থায় কোম্পানিকে ‘ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড’ লোন দিতে অস্বীকার করায় কোম্পানি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ১০ লক্ষ পাউন্ড ঋণের আবেদন জানালে তাদের ঋণ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে কিনা তা খতিয়ে দেখবার জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করলে বাংলার কোম্পানির শাসনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই কমিশনের রিপোর্ট থেকে ইংল্যান্ডের লোক জানতে পারে যে, কোম্পানি তথা বাংলার দুর্দশা বৃদ্ধির জন্য দায়ী ছিল কোম্পানির নায়েব-দেওয়ান ও অন্যান্য কর্মচারীদের সীমাহীন লাভের আকাঙ্খা।

এই অবস্থায়ঃ-

১) ব্রিটিশরা ভারতের শানব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

২) বাংলার দৈত্ব শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

ব্রিটিশ জনগণের এই কোম্পানি বিরোধী মনভাবের ফলশ্রুতি হিসাবেঃ

১) ১৭৭২ সালে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটানো হয়,

২) ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং আইন এবং ১৭৮৪ সালের পীট -এর ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ নেয়।

আইনের শাসন কী ?

ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘আইনের শাসন’ প্রবর্তন । আইনের শাসন -এর অর্থ হল এই যে ‘আইনের নিরপেক্ষতা’ অর্থাৎ দেশের আইনের চোখে সবাই সমান - কেউই আইনের উর্ধ্বে নয় । লর্ড কর্নওয়ালিস প্রথম ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রবর্তন করেন । একটি নির্দেশের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দেন, এখন থেকে জেলা কালেক্টরসহ সমস্ত সরকার কর্মচারীকে তাদের কৃতকর্ম ও অপরাধের জন্য জেলা আদালতে অভিযুক্ত করা যাবে । এমনকি ভারতীয় প্রজারা তাদের সম্পত্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারবে । ‘আইনের শাসন’ দ্বারা লর্ড কর্নওয়ালিস তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদেরও আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করেছিলেন ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন কালে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আইনের শাসন -এর আদর্শ বাস্তবায়িত করা প্রকৃত পক্ষে সম্ভব হয় নি । কারণ:-

(১) ভারতে ইউরোপীয়দের বিচারের জন্য পৃথক আদালত ছিল ।

(২) ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না ।

(৩) ভারতীয় বনাম ইউরোপীয়দের বিচারে ভারতীয়রা ন্যায় বিচার পেত না । এবং

(৪) বিচার ব্যবস্থা ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র ভারতীয়দের বিচারপ্রার্থী হওয়া সম্ভব ছিল না ।               

***