অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[প্রথম অধ্যায়- ৩য়: অংশ]

প্রশ্ন:- (১১) ভারতীয় সিভিল সার্ভিস বলতে কী বোঝ ? ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের গুরুত্ব কী ছিল ? আইনের শাসন বলতে কী বোঝ ?

উত্তরঃ  ভারতে কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যাক্তিগত ব্যাবসা করা এবং ঘুষ ও ভেট নেওয়া প্রভৃতি নানান দুর্নীতিমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে । লর্ড কর্নওয়ালিসের আমল থেকে শাসনকার্যে নিযুক্ত সাধারণ রাজকর্মচারীদের দুর্নীতিমুক্ত করে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থাকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে একদল শিক্ষিত, বুদ্ধিমান ও সূদক্ষ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিয়োগ করার যে প্রথা চালু হয়, তা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস নামে পরিচিত। লর্ড কর্নওয়ালিস ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের প্রকৃত প্রবর্তক।

 

ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের গুরুত্ব:-

প্রথম দিকে ইংল্যান্ডের অভিজাত পরিবারের সন্তানরাই ভারতের সমস্ত উচ্চপদে নিযুক্ত হতেন । কিন্তু ১৮৫৩ সালের সনদ আইন অনুসারে, ইংল্যান্ডে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস-এর কর্মচারী নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারতে এক শ্রেণির দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মচারীর উদ্ভব ঘটে, যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এদেশে ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জন্য ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রধান স্তম্ভ বলা হত। তবে এই শাসন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের কোনো উন্নতি হয়নি, কারণ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের স্বার্থরক্ষা করা।

 

►আইনের শাসন কী ?

ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘আইনের শাসন’ প্রবর্তন । আইনের শাসন -এর অর্থ হল এই যে ‘আইনের নিরপেক্ষতা’ অর্থাৎ দেশের আইনের চোখে সবাই সমান - কেউই আইনের উর্ধ্বে নয় । লর্ড কর্নওয়ালিস প্রথম ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রবর্তন করেন । একটি নির্দেশের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দেন, এখন থেকে জেলা কালেক্টরসহ সমস্ত সরকার কর্মচারীকে তাদের কৃতকর্ম ও অপরাধের জন্য জেলা আদালতে অভিযুক্ত করা যাবে । এমনকি ভারতীয় প্রজারা তাদের সম্পত্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারবে । ‘আইনের শাসন’ দ্বারা লর্ড কর্নওয়ালিস তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদেরও আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করেছিলেন ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন কালে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আইনের শাসন -এর আদর্শ বাস্তবায়িত করা প্রকৃত পক্ষে সম্ভব হয় নি । কারণ:-

(১) ভারতে ইউরোপীয়দের বিচারের জন্য পৃথক আদালত ছিল ।

(২) ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না ।

(৩) ভারতীয় বনাম ইউরোপীয়দের বিচারে ভারতীয়রা ন্যায় বিচার পেত না । এবং

(৪) বিচার ব্যবস্থা ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র ভারতীয়দের বিচারপ্রার্থী হওয়া সম্ভব ছিল না ।               

 

প্রশ্ন:- (১২) রেগুলেটিং আইন কবে পাস হয় ? ভারতে কোম্পানির প্রথম গভর্নর-জেনারেল কে ছিলেন ? লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক সংস্কারসমূহ উল্লেখ করো ।

►উত্তর:-  ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন পাস হয়।

 

►ভারতে কোম্পানির প্রথম গভর্নর-জেনারেল ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক

 

►লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক সংস্কার :

কর্নওয়ালিসের আমল থেকে শাসনকার্যে নিযুক্ত সাধারণ রাজকর্মচারীদের দুর্নীতিমুক্ত করে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থাকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে একদল শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, সুদক্ষ ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিয়োগ করার জন্য যে প্রথা চালু হয়, তা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস নামে পরিচিত । লর্ড কর্নওয়ালিসই ছিলেন ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থা তথা ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার প্রকৃত প্রবর্তক ।  সিভিল সার্ভিস প্রথার মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারতে এক শ্রেণির উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীন চিত্ত, দক্ষ ও পরিশ্রমী সরকারি কর্মচারীর উদ্ভাব ঘটে যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এদেশে ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় । এই জন্য ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রধান স্তম্ভ বলা হত ।

ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থাকে দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে গৃহিত ব্যবস্থা:

(১) কোম্পানির প্রশাসনিক দপ্তর, বাণিজ্য দপ্তর এবং রাজস্ব দপ্তরকে পৃথক পৃথক দপ্তরে পরিণত করা হয় ।

(২) শাসনব্যবস্থা পরিচালনা ও অন্যান্য বিভিন্ন সম্পর্কে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদের দক্ষ করে তোলা হয় ।

(৩) সিভিল সার্ভিসসহ কোম্পানির সমস্ত কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয় ।

(৪) ঘুষ ও ভাত নেওয়াকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয় ।

(৫) সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদের সচ্ছল ও সৎভাবে জীবনযাপনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত বেতন ও সুবিধা বৃদ্ধি করা হয় ।

(৬) ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ভারতে আধুনিক পুলিশিব্যবস্থার ও বিচারব্যবস্থার সূচনা হলেও লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে তা আরও পরিণত ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে । পরবর্তী সময়ে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত শাসন ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারগুলি এক সঙ্গে সংকলিত হয়, যা কর্নওয়ালিস কোড নামে পরিচিত ।

(৭)  লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতীয় প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় ‘আইনের শাসন’ প্রবর্তন করেন । আইনের শাসন -এর অর্থ হল এই যে ‘আইনের নিরপেক্ষতা’ অর্থাৎ দেশের আইনের চোখে সবাই সমান - কেউই আইনের উর্ধ্বে নয় । একটি নির্দেশের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দেন, এখন থেকে জেলা কালেক্টরসহ সমস্ত সরকার কর্মচারীকে তাদের কৃতকর্ম ও অপরাধের জন্য জেলা আদালতে অভিযুক্ত করা যাবে । এমনকি ভারতীয় প্রজারা তাদের সম্পত্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারবে । ‘আইনের শাসন’ দ্বারা লর্ড কর্নওয়ালিস তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীদেরও আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করেছিলেন ।

(৮) ভারতীয়দের চরিত্র, সততা ও শাসন-দক্ষতা সম্বন্ধে লর্ড কর্নওয়ালিস খুব একটা উঁচু ধারনা পোষণ করতেন না, তাই শাসন বা বিচার বিভাগের কোনো উচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ পদে তিনি কোনো ভারতীয়কে নিয়োগ করেন নি । কর্নওয়ালিসের আমল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার উচ্চ পদগুলিতে ‘কেবল মাত্র ইউরোপীয় কর্মচারী নিয়োগ করার নীতি গ্রহন করা হয় ।

উপরোক্ত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, ভারতে ইংরেজ শাসনব্যবস্থার প্রবর্তনে লর্ড কর্নওয়ালিসের অপরিসীম অবদান ছিল ।           

 

প্রশ্ন:- (১৩) পিটস আইন কী ? চার্টার সনদ আইন বলতে কী বোঝ ?

►উত্তর:-  ভারতবর্ষে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ সরকার কোম্পানির কার্যকলাপের ওপর কড়া নজর রাখত, কোম্পানির ও তার কর্মচারীদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য । এই কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একাধিকবার আইন প্রনয়ন করে । ১৭৮৪ সালে পিটের ভারত শাসন আইন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ছোটো পিটের (Young Pit) নামানুসারে এই আইনটি রচিত হয় বলে একে পিটস অ্যাক্ট বা পিটস আইন বলা হয়।

পিটস্‌ আইন অনুসারেঃ

১) গভর্নর জেনারেল পরিষদের সদস্য সংখ্যা চার জন থেকে কমিয়ে তিন জন করা হয়।

২) গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রন সুদৃড় করা হয়।

৩) জরুরি প্রয়োজনে গভর্নর জেনারেলকে তাঁর পরিষদের মতামতকে অগ্রাহ্য করার অধিকার দেওয়া হয়।

৪)  ছয় জন কমিশনার নিয়ে বোর্ড অফ কন্ট্রোল নামে একটি পরিষদ গঠিত হয় ।

৫) পিটের ভারত শাসন আইনে বলা হয়েছিল যে, কোম্পানির কর্মচারীগণ চাকরির পর ভারত থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার পর কী পরিমাণ টাকা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন, তার হিসাব দাখিল করতে হবে ।

 

 চার্টার বা সনদ আইন:-

ভারতবর্ষে কোম্পানির কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাণিজ্য চার্টার বা সনদ প্রদান করতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এই সনদ প্রতি কুড়ি বছর অন্তর অন্তর নবীকরণ করতে হত যা ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে ভারতে কোম্পানির কাজকর্মের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিত। একই সঙ্গে প্রতিটি সনদ আইনের মাধ্যমে কোম্পানির বিভিন্ন অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই যুগে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেওয়া বিভিন্ন সনদ আইনের মধ্যে ১৮১৩ এবং ১৮৩৩ সালের সনদ আইন দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

******