নিয়ত বায়ুপ্রবাহ

[১] নিয়ত বায়ুপ্রবাহ [Planetary or Permanent wind]:- বায়ুচাপের পার্থক্যই নিয়ত বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ, যেখানে বায়ুচাপ বেশি, সেখান থেকে যেদিকে বায়ুচাপ কম, সেদিকেই বায়ু প্রবাহিত হয় । এই নিয়ম মেনে পৃথিবীর চারটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় থেকে তিনটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর ধরে নিয়মিত ভাবে ও নির্দিষ্ট গতিতে প্রবাহিত বায়ুই হল নিয়তবায়ু প্রবাহ । নিয়ত বায়ুপ্রবাহ তিনরকমের হয় যথা:-

[ক] আয়নবায়ু,   [খ] পশ্চিমাবায়ু এবং  [গ] মেরুদেশীয় বায়ু । বায়ুচাপ বলয়ের সঙ্গে এগুলির ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে ।

[ক] আয়নবায়ু [Trade Wind]:- আয়ন কথার অর্থ ‘পথ’ । জাহাজকে সঠিক পথে চলার জন্য এই বায়ু সাহায্য করত বলে একে আয়নবায়ু বলা হয় ।

(i)  উত্তর গোলার্ধে কর্কটীয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে এবং নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত বায়ুকে আয়নবায়ু বলে ।

(ii) পৃথিবীর আবর্তনের জন্য ফেরেলের সুত্র অনুসারে উত্তর গোলার্ধে আয়নবায়ু সরাসরি উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত না হয়ে ডান দিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পূর্ব আয়নবায়ু হিসেবে প্রবাহিত হতে থাকে ।

(iii) পৃথিবীর আবর্তনের জন্য ফেরেলের সুত্র অনুসারে দক্ষিণ গোলার্ধে আয়নবায়ু সরাসরি দক্ষিন থেকে উত্তরে প্রবাহিত না হয়ে বাঁ দিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়নবায়ু হিসেবে প্রবাহিত হতে থাকে ।

(iv) আগেকার দিনে এই বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে পালতোলা জাহাজ চালাতে সুবিধা হত বলে এই বায়ুকে “বাণিজ্য বায়ু” ও বলা হয় ।

(v)  উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ বেশি থাকার জন্য পাহাড়-পর্বতে বাধা পেয়ে উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু একটু ধীর গতিতে ঘন্টায় প্রায় ১৬ কিমি বেগে প্রবাহিত হতে থাকে ।

(vi) দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের পরিমাণ বেশি থাকার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব আয়নবায়ু বাধাহীনভাবে, ও  তুলনামূলক ভাবে দ্রুত গতিতে ঘন্টায় প্রায় ২২.৪ কিমি বেগে প্রবাহিত হয় ।

(vi) উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব, এই দুই রকমের আয়নবায়ুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের কম উষ্ণ স্থান থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বেশি উষ্ণ স্থানের দিকে প্রবাহিত হয় বলে আয়নবায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত সাধারণত হয় না । তাই আয়নবায়ুর গতিপথে পৃথিবীর প্রধান প্রধান মরুভূমি যেমন; থর, কালাহারি, সাহারা প্রভৃতির সৃষ্টি হয়েছে ।

(vii) কিন্তু আয়নবায়ু যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসে তখন মহাদেশগুলোর পূর্বাংশে কিছু কিছু বৃষ্টিপাত ঘটায়, যেমন:- উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল, হাওয়াই এবং উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ।

 

[খ] পশ্চিমাবায়ু [Westerlies]:- উত্তর গোলার্ধে কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর ধরে নিয়মিত ভাবে প্রবাহিত বায়ুপ্রবাহ পশ্চিমাবায়ু নামে পরিচিত । পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয় বলে এই বায়ুকে পশ্চিমাবায়ু বলে । উত্তর গোলার্ধে এই বায়ুপ্রবাহের নাম দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ুপ্রবাহের নাম উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু । উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকার জন্য দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবাহিত উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ুর গতিবেগ উত্তর গোলার্ধে প্রবাহিত পশ্চিমাবায়ুর তুলনায় অনেক বেশি । তাই দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবাহিত পশ্চিমাবায়ুকে প্রবল পশ্চিমাবায়ু বলা হয় ।

(i)  পশ্চিমাবায়ু উত্তর গোলার্ধে কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় (৩০ উত্তর অক্ষাংশ) থেকে সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের (৬০ উত্তর অক্ষাংশ) দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ের (৩০ দক্ষিণ অক্ষাংশের) থেকে কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের (৬০ দক্ষিণ অক্ষাংশের) দিকে প্রবাহিত হয় ।

(ii)  ফেরেলের সুত্র অনুসারে পশ্চিমাবায়ু উত্তর গোলার্ধে সরাসরি দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত না হয়ে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু হিসাবে প্রবাহিত হয় ।

(iii)  ফেরেলের সুত্র অনুসারে পশ্চিমাবায়ু দক্ষিণ গোলার্ধে সরাসরি উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত না হয়ে বামদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু হিসাবে প্রবাহিত হয় ।

(iv) উত্তর গোলার্ধে পাহাড়-পর্বত-স্থলভাগ বেশি থাকার জন্য পাহাড়-পর্বতে বাধা পায় বলে এই গোলার্ধে প্রবাহিত দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ুর গতিবেগ কিছুটা কম । পশ্চিমাবায়ুর গতিপথে উত্তর গোলার্ধে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় হয় ।

(v)  দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর গোলার্ধের তুলনায় জলভাগ বেশি থাকার জন্য এই গোলার্ধে প্রবাহিত উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ুর গতিবেগ উত্তর গোলার্ধে প্রবাহিত পশ্চিমাবায়ুর গতিবেগের তুলনায় অনেক বেশি, তাই এই বায়ুপ্রবাহ প্রবল পশ্চিমাবায়ু নামেও পরিচিত ।

(vi) দক্ষিণ গোলার্ধে পাহাড়-পর্বত-স্থলভূমির বাধা না থাকার জন্য এই গোলার্ধে পশ্চিমাবায়ু দুরন্ত গতিবেগে প্রবাহিত হয় এবং ৪০- ৬০ দক্ষিণ অক্ষাংশে এই বায়ুর গতিবেগ খুব বেশি । সেখানে এই বায়ু প্রবাহ গর্জনশীল চল্লিশা [Roaring Forties বা Brave West Wind] নামে পরিচিত ।

(vii) পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির ফলে বায়ুচাপ বলয়গুলির উত্তর ও দক্ষিণে স্থান পরিবর্তনের ফলে উত্তর গোলার্ধে ৩০- ৪৫ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অংশে শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে) দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু প্রবাহিত হয় আর গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে জুন) প্রবাহিত হয় উত্তর-পূর্ব পশ্চিমাবায়ু ।

(viii) শীতকালে জলভাগের চেয়ে স্থলভাগ বেশি শীতল থাকায় পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে শীতকালে বৃষ্টিপাত বেশি হয় । দক্ষিণ গোলার্ধে স্থলভাগ কম থাকার জন্য এই ধরনের বৃষ্টিপাত স্থলভাগের সামান্য অংশেই (৩০-৪০ দক্ষিণ অক্ষাংশে) সীমাবদ্ধ থাকে ।

(ix) পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে মহাদেশগুলির পূর্ব অংশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ক্রমশ কমে যেতে থাকায় মহাদেশগুলির এই অঞ্চলের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অংশে নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি দেখতে পাওয়া যায় । এই তৃণভূমি উত্তর আমেরিকায় প্রেইরি, দক্ষিণ আমেরিকায় পম্পাস, রাশিয়া ও ইউরোপে স্টেপস্‌ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ডাউনস্‌ নামে পরিচিত ।

(x) আয়নবায়ুর গতির ঠিক উল্টো দিক থেকে প্রবাহিত হয় বলে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহ দুটিকে প্রত্যায়ন বায়ু ও বলা হয় । উত্তর গোলার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম প্রত্যায়ন বায়ু [South-West Anti-Trade Wind] এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু উত্তর-পশ্চিম প্রত্যায়ন বায়ু [North-West Anti-Trade Wind] নামেও পরিচিত ।

 

গর্জনশীল চল্লিশা [Roaring Forties বা Brave West Wind] :-  উত্তর গোলার্ধে জলভাগের চেয়ে স্থলভাগ বেশি থাকায় স্থলভাগের পাহাড়-পর্বতে পশ্চিমাবায়ুর প্রবাহ বাধা পায় । দক্ষিণ গোলার্ধে ৪০ দক্ষিণ অক্ষাংশের পর জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ অনেক কম থাকায় বায়ুপ্রবাহের গতিপ্রবাহে পাহাড় পর্বতের ঘর্ষণজনিত বাধা অনেক কম হয় । ফলে পশ্চিমাবায়ুর গতিপথে কোনোরকম বাধার সৃষ্টি হয় না । এজন্য দক্ষিণ গোলার্ধের ৪০- ৬০ দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে বিস্তৃত জলভাগের ওপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমাবায়ু সারা বছর ধরে বাধাহীনভাবে, প্রবল গর্জন করতে করতে প্রচন্ড বেগে প্রায় সোজা পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় বলে, ৪০- ৬০ দক্ষিণ অক্ষাংশকে গর্জনশীল চল্লিশা বলে । 

 

[গ] মেরুদেশিয় বায়ু [Polar Wind]:- এই বায়ু সুমেরু ও কুমেরু উভয় গোলার্ধে মোটামুটি ভাবে ৭০- ৮০ অক্ষরেখার মধ্যে উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয় । পৃথিবীর আবর্তনের জন্য এইবায়ু প্রবাহ উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব মেরুবায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব মেরুবায়ু হিসাবে প্রবাহিত হয় । এই দুই বায়ুপ্রবাহ খুবই শীতল এবং শুকনো । দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ুপ্রবাহের ফলে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হয় ও তুষারপাত ঘটে ।   

(i)  মেরুবায়ু সাধারণত উভয় গোলার্ধে মোটামুটি ৭০- ৮০ অক্ষরেখার মধ্যে মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্তপ্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর ধরে প্রবাহিত হয় । উত্তর গোলার্ধে এই বায়ু উত্তর-পূর্ব মেরুবায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ু দক্ষিণ-পূর্ব মেরুবায়ু নামে পরিচিত । এই দুই বায়ুপ্রবাহ খুবই শীতল এবং শুকনো ।

(ii)  মেরুবায়ু উত্তর গোলার্ধে ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁ দিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় ।

(iii)  দুই গোলার্ধেই মেরুবায়ু তাদের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে প্রায় ৯০ পর্যন্ত বেঁকে যায় ।

(iv)  উত্তর গোলার্ধে স্থানীয় আবহাওয়ার গোলযোগের জন্য অনেক সময় মেরুবায়ু বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়ে থাকে ।

(v)  দক্ষিণ গোলার্ধে মেরুবায়ু অনেক বেশি নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয় ।

(vi)  মেরুবায়ু বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চল থেকে আসে বলে এই বায়ু অসম্ভব ঠান্ডা ও শুকনো ।

(vii)  শীতকালে মেরুবায়ুর প্রভাব বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বেশি হয় ।

(viii)  মেরুবায়ু দুই মেরুবৃত্তে তুষার ঝড়ের সৃষ্টি করে । 

(ix) জলদস্যু ভাইকিংরা উত্তর ইউরোপ (নরওয়ে, সুইডেন) থেকে উত্তর-পূর্ব মেরুবায়ুর গতিপথ ধরে উত্তর আমেরিকায় অভিযান করত এবং পশ্চিমাবায়ুর গতিপথ ধরে আবার দেশে ফিরে আসত । এখনকার দিনেও ইউরোপ থেকে আমেরিকায় বিমানে যেতে হলে মেরুবায়ুর গতিপথ অনুসরণ করতে হয় ।

***