নদীর পার্বত্যগতি ও সৃষ্ট ভূমিরূপ

নদীর পার্বত্য গতি : নদীর ক্ষয়সাধন ও বহনের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

পার্বত্যঅঞ্চলে নদীর প্রাথমিক গতি । এখানে নদীর স্রোত খুব প্রবল ও গভীরতা খুব বেশি । নদী এখানে খুব বেশি চওড়া হয় না । পর্বতের গা দিয়ে আঁকা বাঁকা পথে নদী এখানে বইতে থাকে এবং নানা রকমের ভূমিরূপ গঠন করে থাকে ।

 

আড়াআড়ি পাড় বা  অন্তর্বদ্ধ শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ [Interlocking Spur]: পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, আড়াআড়ি পাড় বা  অন্তর্বদ্ধ শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ [Interlocking Spur] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ বা নদীর প্রবাহ পথে, নদীর ঘর্ষণের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত  ও খাঁজ-কাটা শৈলশিরাগুলিকে অভিক্ষিপ্তাংশ বলে। পার্বত্য অঞ্চলে কোনও নদীর গতিপথে অনেক সময় পাহাড়গুলির অভিক্ষিপ্তাংশ এমন ভাবে বিন্যস্ত থাকে যে, নদীর প্রবাহপথের একটি অংশ আর একটি অংশ থেকে আড়াল হয়ে যায় এবং নদীটি সামান্য একটু বাঁক নিয়ে এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হতে বাধ্য হয় । এই অবস্থায় দূর থেকে দেখলে নদীটির গতিপথ আড়াল হয়ে এবং মনে হয় শৈলশিরাগুলি যেন আবদ্ধ অবস্থায় আছে, একে তখন আড়াআড়ি পাড় বা অন্তর্বদ্ধ শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ [Interlocking Spur] বলে।

 

কর্তিত স্পার [Truncated Spur]: পার্বত্য উপত্যকা দিয়ে যখন হিমবাহ অগ্রসর হয়, সে সময় এই হিমবাহের গতিপথে যেসব স্পার [Spur] বা পর্বতের অভিক্ষিপ্তাংশ হিমবাহের গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে থাকে, হিমবাহ সেগুলিকে কেটে বা ক্ষয় করে সোজা পথে অগ্রসর হয় এবং খাড়া ঢালের সৃষ্টি করে । এর ফলে পর্বতশিরার অবতল ও উত্তল ঢালটি হঠাৎ খাড়াভাবে হিমবাহ উপত্যকায় নেমে আসে । এইভাবে হিমবাহ দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত এবং ত্রিভূজের মতো দেখতে শৈলশিরাগুলোকে কর্তিত স্পার [Truncated Spur] বা পল কাটা স্পার বলে । যে কোনো নদীর পার্বত্য গতিপথে এই ধরনের বাধা থাকলে নদীটি এঁকে বাঁক প্রবাহিত হয়, যার ফলে আড়াআড়ি পাড় বা  অন্তর্বদ্ধ শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ [Interlocking Spur] -এর সৃষ্টি হয় । হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা প্রভৃতি নদীর গতিপথে কর্তিত শৈলশিরা [Truncated Spur] দেখা যায় ।

 

V -অক্ষরের উপত্যকা ও গিরিখাত [V-Shaped Valley & Gorge]: পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, V -অক্ষরের উপত্যকা ও গিরিখাত [V-Shaped Valley & Gorge] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । পার্বত্য অঞ্চলে স্রোতের বেগ প্রচন্ড হওয়ায় নদী বড় বড় শিলাখন্ড, নুড়ি, পাথর প্রভৃতি বহন করে নামতে থাকে । শিলাখন্ডের আঘাতে নদীগর্ভ ক্ষয় হয় । পার্বত্যপথে নদীর ইংরেজি I অথবা সরু  V আকৃতির নদী-উপত্যকা যখন খুব গভীর হয়, তখন তাকে গিরিখাত [Gorge] বলে । গিরিখাত যতটা গভীর ততটা চওড়া নয় । কখনো কখনো এই সমস্ত গিরিখাতের তলদেশের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী পর্বতের চূড়ার মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য প্রায় কয়েক হাজার মিটার হয়।

উদাহরণ- শতদ্রু, সিন্ধু, তিস্তা প্রভৃতি নদীর হিমালয়ের পার্বত্য গতিপথে গভীর নদী উপত্যকা বা গিরিখাত দেখতে পাওয়া যায় । সিন্ধুনদের অরুণ গিরিখাত বিখ্যাত । দক্ষিণ পেরুর কল্কা নদীর গিরিখাতটি হল বিশ্বের গভীরতম গিরিখাত যার গভীরতা  সর্বাধিক ৪,৩৭৫ মিটার ।

 

জলপ্রপাত [Waterfalls] ও প্রপাত কূপ [Plunge-pool] পার্বত্য প্রবাহে নদীর গতিপথে আড়াআড়ি ভাবে কোনো কঠিন শিলা থাকলে, সেই কঠিন শিলা পাশের কোমল শিলা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষয় পায় এবং কালক্রমে উঁচু হয়ে থাকে । নদীস্রোত সেই খাড়া ঢাল থেকে বিপুল বেগে নীচের কোমল শিলায় পড়ে জলপ্রপাতের [Walerfalls] সৃষ্টি করে । নদীর গতিপথের যে অংশে জলপ্রপাতের জলধারা সজোরে এসে পড়ে সেখানে এই জলধারা সজোরে এসে পড়ার ফলে মন্থকূপের সৃষ্টি হয় যাকে প্রপাতকূপ [Plunge-pool] বলে । জলপ্রপাতের উপস্থিতির ফলে নীচের কোমল শিলাস্তরের ভিতরের অংশের দ্রুত ক্ষয় হওয়ায় এই ধরনের জলপ্রপাত ধীরে ধীরে পিছনের দিকে সরে আসতে থাকে, একে জলপ্রপাতের পশ্চাদপসরণ বলে । দক্ষিণ-আমেরিকার ভেনিজুয়ালার অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাতটি হল পৃথিবীর  উচ্চতম জলপ্রপাত ।

 

ক্যানিয়ন [Canyon] : পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ক্যানিয়ন [Canyon] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । বৃষ্টিহীন মরুপ্রায় শুষ্ক অঞ্চলে ইংরেজী ‘I’ অক্ষরের মতো গিরিখাতকে ক্যানিয়ন [Canyon] বলা হয় । দীর্ঘপথ ধরে বৃষ্টিহীন পার্বত্য মরূ অঞ্চল দিয়ে কোনো নদী প্রবাহিত হলে নদীর জলের স্বল্পতার জন্য নদীখাতে শুধু মাত্র নিম্নক্ষয় হয় । শুষ্ক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম, ফলে দুই পাড় ভেঙ্গে জল নদীতে নেমে আসে না । তাই নদীর পার্শ্বক্ষয় বিশেষ হয় না । শুধুমাত্র নিম্নক্ষয়ের জন্য ‘I’ আকৃতির সুগভীর খাত বা ক্যানিয়ন [canyon] -এর সৃষ্টি হয় ।

উদাহরণ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় কলোরাডো নদী পৃথিবী বিখ্যাত গ্রান্ড ক্যানিয়ন সৃষ্টি করেছে যার দৈর্ঘ হল ৪৪৬ কিলোমিটার এবং কোথাও কোথাও এর গভীরতা ১.৬ কিলোমিটারেরও বেশি ।

***